দ্রুত দেবে যাচ্ছে ঢাকা

· Prothom Alo

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মেরু অঞ্চলের বরফ গলা কিংবা শক্তিশালী ঝড়ের খবরই শিরোনামে থাকে। কিন্তু বিশ্বের অনেক মেগাসিটি বা জনবহুল শহরের জন্য সমস্যাটি কেবল পানির স্তর বেড়ে যাওয়া নয়; পায়ের নিচের মাটিই ধীরে ধীরে নিচে দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই নীরব ধস কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সম্প্রতি নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে ৪০টি প্রধান নদী বদ্বীপ বা ডেল্টার মানচিত্র তৈরি করেছেন, যেখানে দেখা গেছে, সমুদ্রের পানি যে গতিতে বাড়ছে, মাটি দেবে যাওয়ার গতি তার চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা খেয়াল করেছেন বিজ্ঞানীরা।

Visit truewildgame.com for more information.

নদী বদ্বীপ পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ হলেও এখানে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ বাস করে। বিশ্বের বড় ৩৪টি শহরের ১০টিই এই নিচু বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত। এর মধ্যে গঙ্গা বদ্বীপে কলকাতা ও ঢাকা, নীল নদে আলেকজান্দ্রিয়া, ইয়াংজিতে সাংহাই এবং মেকং বদ্বীপে হো চি মিন সিটি অন্যতম। এই অঞ্চলগুলো মূলত অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, যেখানে বড় বড় বন্দর, বিমানবন্দর এবং শিল্পাঞ্চল অবস্থিত। অধিকাংশ বদ্বীপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ থেকে ২ মিটার (৩ থেকে ৬ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। ফলে মাটির সামান্যতম অবনমনও এই শহরগুলোর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইটের ১০ বছরের রাডার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অর্ধেকের বেশি বদ্বীপ বছরে ৩ মিলিমিটারের চেয়ে দ্রুত নিচে নামছে। থাইল্যান্ডের চাও ফ্রায়া, ভিয়েতনামের মেকং এবং চীনের ইয়েলো নদী বদ্বীপে এখন সমুদ্রের পানি বাড়ার চেয়ে মাটি দেবে যাওয়াই প্রধান আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাটি মাত্র কয়েক ইঞ্চি দেবে গেলেই বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

বদ্বীপের মাটি প্রাকৃতিক নিয়মেই কিছুটা পরিবর্তনশীল। কিন্তু মানুষের কিছু কর্মকাণ্ড এই ধসকে ত্বরান্বিত করছে। বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত পানি তোলার কারণে মাটির নিচের স্তরগুলো সংকুচিত হয়ে যায় এবং ভূমি দেবে যায়। তেল ও গ্যাস উত্তোলনের ফলে মাটির ভেতরে শূন্যতা তৈরি হয়। মেগাসিটিগুলোর বিশাল সব দালান ও স্থাপনার ভার নরম মাটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বদ্বীপে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, সেখানেই ভূমি দেবে যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। ঢাকা, কলকাতা, ব্যাংকক, সাংহাই ও ইয়াঙ্গুন এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ মিটারেরও কম উচ্চতায় বসবাসকারী ৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে ৮৪ শতাংশই (প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ) এমন এলাকায় বাস করছেন, যেখানে ভূমি দ্রুত দেবে যাচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ায় ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। তবে আমেরিকা মহাদেশের মিসিসিপি এবং আমাজন বদ্বীপও এই ৫টি এশীয় বদ্বীপের মতোই সংকটাপন্ন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সহকারী অধ্যাপক লিওনার্ড ওহেনহেন বলেন, ‘আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, ৪০টির মধ্যে ১৮টি বদ্বীপে ভূমিধসের হার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করার পাশাপাশি ভূমি দেবে যাওয়া রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মহাকাশ থেকে নিখুঁতভাবে সেন্টিমিটারের ভগ্নাংশ পরিমাণ পরিবর্তনও পরিমাপ করতে সক্ষম, এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখন কেবল সমুদ্রের পানিকে আটকে রাখাই চ্যালেঞ্জ নয়। পায়ের নিচের মাটিকে স্থিতিশীল রাখাই হবে আগামী কয়েক দশকের প্রধান লড়াই।

সূত্র: আর্থ

Read full story at source