বই পড়াকে আনন্দময় করে তুলতে পেরেছি—মো. শাহ্জাহান কবীর
· Prothom Alo

সাধারণত আমরা পাঠচক্র করি কোনো পাঠাগারে বসে, কিংবা কোনো বন্ধুর বাড়িতে, কিংবা কোনো বইয়ের দোকানে অথবা কোনো খোলা জায়গায়। কিন্তু পাঠচক্র যদি হয় বইয়ের কাহিনি ও চরিত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন কোনো পরিবেশে, তাহলে কেমন হয়! যশোরের মো. শাহ্জাহান কবীর কয়েক বছর ধরে এমন অভিনব, আনন্দদায়ক পাঠচক্রের আয়োজন করছেন। ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এই তরুণের সঙ্গে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে বই পড়া ও পাঠচক্রের পুরো বিষয়টা আমরা জেনে নেব। কিশোর আলোর হয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী আলিম-উজ-জামান
আপনারা কবে থেকে পাঠচক্র শুরু করলেন?
Visit xsportfeed.quest for more information.
শাহ্জাহান কবীর: লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। আমি মনে হয়, সারা জীবন শিক্ষকই হতে চেয়েছিলাম। তা–ই হলাম। শুরু থেকেই চেয়েছিলাম, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বই পড়াব। তাদের মধ্যে নানা কিছুর চিন্তার বীজ বপন করব। সেই চিন্তা থেকে ২০১৬ সালে প্রথম ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ নামে ফেসবুকে গ্রুপ খুলি। আমরা চেয়েছিলাম, শিক্ষার্থীরা যেন সপ্তাহে অন্তত একটি বই পড়ে বা বইয়ের সংস্পর্শে থাকে। তবে মূল কাজ শুরু হয় আরও পরে, ২০২১ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ফেসবুক গ্রুপটিতে বইয়ের রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। যথেষ্ট সাড়া পাই। পরে একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রিভিউয়ে অংশ নেওয়া সবাইকে পুরস্কৃত করি। এ আয়োজনের পরের মাসে (অক্টোবর) ২০ শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীর অংশগ্রহণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটক নিয়ে প্রথম পাঠচক্র শুরু করি।
আপনারা যে ভিন্ন উপায়ে পাঠচক্র করেন, এটার ধারণা কীভাবে পেলেন?
শাহ্জাহান কবীর: শুরুতে অনেকেই আগ্রহ দেখায়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। আমাদেরও তা–ই হলো। নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজন করতে পারছিলাম না। কারণ, উপস্থিতি কম হচ্ছিল। আবার অনেকেই বই না পড়ে পাঠচক্রে আসছিলেন। এমন ব্যর্থতা থেকেই নিজেরা আলোচনায় বসি। এভাবে ভাবনা আসে, বইয়ের চরিত্র ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে যদি কাছাকাছি একটি স্থান খুঁজে নেওয়া যায়, একটা আবহ তৈরি করা যায়, কেমন হয়! সবাই এ ধারণার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। আমরা এর নাম দিই ‘প্রতিবেশ অধ্যয়ন’। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ বইটি নিয়ে খুলনার ফুলতলার দক্ষিণডিহিতে বিশ্বকবির শ্বশুরবাড়িতে পাঠচক্রের আয়োজন করি। পাঠচক্রের সদস্যদের কাছে আনন্দের ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে এ আয়োজন।
‘তোদের দিয়ে মেডিকেল পড়া হবে না, গানবাজনা কর’তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যয়ের কবি উপন্যাস নিয়ে প্রতিবেশ অধ্যয়নএখন পর্যন্ত কয়টি জায়গায় এ রকম পাঠচক্র করেছেন?
শাহ্জাহান কবীর: গত তিন বছরে বিভিন্ন বই নিয়ে ১৫টি স্থানে ২৫টির বেশি প্রতিবেশ অধ্যয়ন করেছি। প্রথম ২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘শেষের কবিতা’ বইটি নিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি খুলনার ফুলতলায় দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে যাই। মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ‘পারস্যপ্রতিভা’ বইটি নিয়ে যশোরের ঝিকরগাছার গদখালি ফুলবাগানে তিন বছরে তিনবারের মতো পাঠচক্র করেছি। নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে বুদ্ধদেব বসুর ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’ বইটি নিয়ে আলোচনা করেছি। পরের বছর একই স্থানে পাঠচক্র করেছি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’ নিয়ে। কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটায় ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ নিয়ে আলোচনার আসর বসে। কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং ছেঁউড়িয়ায় লালন কমপ্লেক্সে সুধীর চক্রবর্তী প্রণীত জীবনীগ্রন্থ ‘লালন’ নিয়ে প্রতিবেশ অধ্যয়ন হয়েছে। যশোরের সুলতানপুর গ্রামের মাঠে বিস্তৃত হলুদ শর্ষেখেতের পাশে রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’ বইটি নিয়ে পাঠচক্র করেছি। পাঠচক্র করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের।
দু-একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাই।
শাহ্জাহান কবীর: একবার বর্ষাকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে পাঠচক্রের বন্ধুরা ছাতা মাথায় দিয়ে বইয়ের আলোচনা চালিয়ে গেছে। চায়ের দোকানে এসে বৃষ্টিতে আটকা পড়ে তুমুল আলোচনায় মশগুল হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা আছে। আবার কখনো কোনো প্রতিবেশ অধ্যয়নে পাঠচক্র বন্ধুরা ওই বইয়ের চরিত্র ধারণ করে আকস্মিক অভিনয় করে আমাদের অভিভূত করেছেন; আনন্দ দিয়েছেন। বিশেষত একবার দক্ষিণডিহিতে ‘শেষের কবিতা’ বই নিয়ে অমিত, লাবণ্য ও শোভনলাল চরিত্রে পাঠচক্র বন্ধুরা অভিনয় করে, তর্কে-বিতর্কে আমাদের প্রভূত আনন্দ দিয়েছেন। সেই প্রতিবেশ অধ্যয়নে কাঁধে করে নকশিকাঁথায় মোড়ানো মাটির হাঁড়িতে রসের পিঠা ও অন্যান্য পিঠা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে জামাই গমনের আবহ তৈরি অত্যন্ত মজার ছিল; স্মৃতিধন্য ছিল। দক্ষিণডিহিতে আসা দর্শনার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যেও অনেক কৌতূহল ছিল। অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে নিয়ে সে পিঠা ভাগাভাগি করে খাওয়া আরও আনন্দের ছিল।
‘অনুভূতি হয়ে উঠুক লেভেল ফাইভ’‘প্রতি সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ সংগঠনের সঙ্গে আর কে কে যুক্ত আছেন? তাঁরা কীভাবে ভূমিকা পালন করেন?
শাহ্জাহান কবীর: যাঁরা আমাদের পাঠচক্রের সদস্য, এক বছর সফলভাবে পাঠচক্র শেষ করার পর তাঁরা এই সংগঠনের বিভিন্ন পদে যুক্ত হতে পারেন। আমাদের সংগঠনে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন। তবে শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। পাঠচক্র ছাড়াও আমরা কিছু কাজ করি। যেমন ঈদে পাঠচক্র বন্ধুদের বাড়ি ফেরা উপলক্ষে ‘গ্রামের শিশুদের জন্য বই উপহার প্রদান অনুষ্ঠান’ করা হয়। পাঠচক্র বন্ধুদের লেখা প্রবন্ধ নিয়ে সেমিনার, আলোচনা, একক বক্তৃতা অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী করা হয়। এসব কাজ পাঠচক্রের বন্ধুরাই করে থাকেন। এ ছাড়া আমাদের ‘উচ্চতর অধ্যয়ন সভা’য় এক বছর মেয়াদি পাঠচক্র সম্পন্নকারী সদস্যরা একক বক্তৃতা, সেমিনার ও একক আলোচনার সুযোগ পান। পাঠচক্র সদস্যদের লেখা ও সম্পাদনায় বের হয় ‘সাহিত্য চর্চাপত্র’ নামক সাহিত্য সাময়িকী।
আপনার বই পড়ার অভ্যাস কীভাবে তৈরি হয়েছে?
শাহ্জাহান কবীর: আমার দুই শিক্ষক মো. আজিজুল ইসলাম ও মো. সিরাজুল ইসলাম, সম্পর্কে আমার চাচা, তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে বেশ কিছু বই ছিল। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার সেসব বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়। দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই প্রায় সব বই আমার পড়া হয়ে যায়। তখন আমার কিশোর মনে নানা ভাবনা শুরু হয়। বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে বসবাস করতে থাকি। এ সময় বন্ধুদের নিয়ে নিজের ঘরেই একটি পাঠাগার তৈরি করি। বন্ধু ও আশপাশের মানুষদের বই পড়তে উৎসাহিত করি। কিন্তু সে সময় বিশেষ সফল হতে পারিনি। কেন সফল হতে পারলাম না, এটা নিয়ে পরে অনেক ভেবেছি। আমি এখন যশোরের সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়ার পর নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসে মাস্টার্স ইন এডুকেশনের সুযোগ পেয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের সদস্য হই। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাই। স্যারের কাছ থেকে পেয়ে যাই জীবনকে নির্মলভাবে উপভোগ করার সোনার কাঠি। পাশাপাশি ২০১২ সালে ‘ছায়ানট’ একবার পাঠচক্র শুরু করেছিল। সে বছর প্রথম আবর্তনে অংশ নিয়েছিলাম। ফলে পাঠচক্র বিষয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল।
পাখির ভাষা বোঝেন যিনিমো. শাহ্জাহান কবীরচারপাশের মানুষেরা আপনাদের এই কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
শাহ্জাহান কবীর: আনন্দের জন্য পাঠচক্র শুরু করেছিলাম। কে কী মূল্যায়ন করবে, এমন চিন্তা করিনি। শুরুতেই অনেক তিরস্কার, কটূক্তি, উপহাস ও নিরুৎসাহের শিকার হয়েছিলাম। থেমে থাকিনি। তবে অর্জনও কম নয়। আমাদের পাঠচক্রের কথা জানতে পেরে একদিন যশোরের তৎকালীন জনপ্রিয় জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান আমাকে তাঁর বাংলোয় ডাকলেন। তিনি অভিভূত হলেন। আমাকে অনুরোধ করলেন যশোর কালেক্টরেট স্কুলে ছোটদের পাঠচক্র পরিচালনা করতে। যশোর জেলা প্রশাসন স্কুলটি পরিচালনা করে। আমরা আনন্দের সঙ্গে সেই দায়িত্ব নিলাম।
২০২২ সালে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির নির্বাচিত ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ছোটদের পাঠচক্র ‘অধ্যয়ন সভা: প্রথম আবর্তন’ শুরু হলো। সেখানে ১০-১২টি বই নিয়ে ছয় মাসমেয়াদি পূর্ণাঙ্গ পাঠচক্র শেষ করি। তমিজুল ইসলাম খান থাকাকালে দুটি পূর্ণাঙ্গ আবর্তন শেষ করতে পেরেছিলাম।
পাঠচক্রের নান্দনিক আয়োজনে পর অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছেন। এখন চারপাশের মানুষ প্রশংসা ও উৎসাহিত করেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন অনেকে। দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ, বন্ধুজন এখন খোঁজখবর নেন। দেশের অনেকে চিঠির মাধ্যমে সাধুবাদ জানিয়েছেন। যশোরের সুধীজনও সমীহের দৃষ্টিতে দেখে এ প্রতিষ্ঠানকে।
সামনের দিনগুলোয় আপনাদের পাঠচক্রকে কোথায় নিয়ে যেতে চান? আগামী দিনের পরিকল্পনা জানতে চাই।
শাহ্জাহান কবীর: কিছু মানুষের কাছে আমরা বই পড়াকে আনন্দময় করে তুলতে পেরেছি বলে মনে করি। তবে যখন ঢাকা, কুড়িগ্রাম বা অন্যত্র থেকে কেউ চিঠি লিখে অভিনন্দন জানান বা দেশ-বিদেশ থেকে ফোন করে পাঠচক্র সম্পর্কে জানতে চান, তখন অনুভব করি আরও উদ্যমী হতে হবে; আরও কাজ করতে হবে। আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস সৃষ্টিতে কাজ করে যেতে চাই। মানুষ কারণ–অকারণ বই পড়ুক। হরিষে–বিষাদে বই পড়ুক। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়ুক। সে লক্ষ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে, সুযোগ নির্মাণে কাজ করে যেতে চাই। সামনের দিনগুলোয় পাঠচক্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং আরও বেশি বেশি মানুষকে বইয়ের রাজ্যে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা থাকবে।
জেনারেশনের পর জেনারেশন আমাদের গান শুনছে—ওয়ারফেজ