এই অধ্যাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করবে

· Prothom Alo

বাংলাদেশে ১৩তম সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) অধ্যাদেশ।

এই অধ্যাদেশ প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ৬০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ছিলেন। এমন বিস্তৃত অংশগ্রহণ এবং সবার অন্তর্ভুক্তিতে খসড়া প্রণয়ন করার প্রক্রিয়াটি ছিল নজিরবিহীন।

Visit een-wit.pl for more information.

এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে ২০০৯ সালের আইনে বিদ্যমান কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ও চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের জন্য প্রয়োজন যথাযথ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা, যাতে এটি মানুষের অধিকার সুরক্ষায় আরও শক্তভাবে কাজ করতে পারে। দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মানবাধিকার অধ্যাদেশ নিয়ে সংসদে আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশের বৈধতা দেওয়া জরুরি

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের একটি কেন্দ্রীয় অংশ। সরকার ও সংসদের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে এই অধ্যাদেশ অনুমোদনের মাধ্যমে এবং উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে কমিশনকে আরও কার্যকর করে গড়ে তোলার। এর ফলে কমিশনের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সুদৃঢ় হবে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সব মানুষের সেবায় তার ভূমিকা আরও কার্যকর হবে।

একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন সবার আগে দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধ। এটি কোনো গৌণ ধরনের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন ও জন–আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করা, আইন প্রণয়নে পরামর্শ দেওয়া, ভুক্তভোগীদের সহায়তা করা এবং জবাবদিহি জোরদার করতে সহায়তা করার মাধ্যমে এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে প্যারিস প্রিন্সিপলসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করার। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার বৈশিষ্ট্য হবে স্বাধীনতা, সবার প্রতিনিধিত্ব, বিস্তৃত ম্যান্ডেট, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে অর্থবহ সম্পৃক্ততা।

বিশ্বের অনেক দেশে জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো (এনএইচআরআই) কাঠামোগত মানবাধিকার সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি জোরদার করতে এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ ও গঠনমূলক সুপারিশের মাধ্যমে উদীয়মান সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শক্তিশালী করা হলে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও এ ধরনের একটি কৌশলগত ভূমিকা পালন করতে পারে।

বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, এই অধ্যাদেশ কমিশনকে মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে আরও স্পষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, তদন্ত পরিচালনা, আটক বা বন্দিত্বের স্থান পরিদর্শন এবং প্রতিকার চাওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে।অধ্যাদেশটি গ্রহণের আগে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বহু অভিজ্ঞের সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শ করা হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও অন্যান্য অংশীদার সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি এতে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রোটোকলের অধীন কমিশনকে ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালনের জন্য কমিশনের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

১৮ মাসে ১১৫ অধ্যাদেশ: সংবিধান কী বলে?

আমরা এই অধ্যাদেশকে স্বাগত জানাই। কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি দীর্ঘদিনের কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করেছে, যা কমিশনকে প্যারিস প্রিন্সিপলসের সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য অর্জনে বাধা দিচ্ছিল। যেমন আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘাটতি এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। দেশ গঠনের এমন এক সময়ে, যখন জবাবদিহি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং জন–আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন এই অগ্রগতি রক্ষা করা এবং সংসদীয় আলোচনা ও আইন প্রণয়নের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া ভীষণ প্রয়োজন।

জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন এই কমিশন সাধারণত সংবিধান বা আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। তাই প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট, স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংসদে কার্যকর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সংসদের দায়িত্ব হলো দেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা যার ম্যান্ডেট বিস্তৃত, স্বাধীনতা সুরক্ষিত এবং যা সব মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে পারে, যাতে কোনো ভুক্তভোগী উপেক্ষিত না হয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে প্যারিস প্রিন্সিপলসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করার। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার বৈশিষ্ট্য হবে স্বাধীনতা, সবার প্রতিনিধিত্ব, বিস্তৃত ম্যান্ডেট, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে অর্থবহ সম্পৃক্ততা।

বহুদিন ধরে বাংলাদেশের অসংখ্য নারী-পুরুষ এমন একটি কমিশনের প্রত্যাশা করে আসছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হবে, জন–আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যাত্রা আরও এগিয়ে যাবে।

  • স্টেফান লিলার জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়কারী ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি

  • অজিত সিং বাংলাদেশে অবস্থিত কানাডার হাইকমিশনার

  • ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত

  • বোরিস ভ্যান বোমেল বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত

  • হাকন আরল্ড গুলব্রান্ডসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত

মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source