একাত্তরকে কোনো দলের এজেন্ডা বানানো যাবে না
· Prothom Alo

বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তাঁদের সম্মান দিতে হবে। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকেই আহত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয়।
গোপালগঞ্জে প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে আয়োজিত ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন বীরাঙ্গনা হেলেনা বেগম। অনুষ্ঠানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করেন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
Visit lej.life for more information.
প্রথম আলো বন্ধুসভা আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড–২০২৬–এর লোগোনতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে আজ বেলা ১১টায় গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়।
‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে প্রথমবারের মতো সারা দেশে মার্চ মাসজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেছে বন্ধুসভা। এর অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ সবার জন্য অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতা এবং প্রথম আলোর ওয়েব পেজ ও বন্ধুসভার ফেসবুক পেজে প্রতিদিন কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গোপালগঞ্জে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬ অনুষ্ঠানে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিরা। রোববার দুপুরে গোপালগঞ্জে বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজেপ্রথম আলোর গোপালগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি ফারদুল্লাহ লস্করের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুর রহমান, বন্ধুসভার উপদেষ্টা লেখক মিন্টু হক, গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক অনুপম কুমার বিশ্বাস, সীতারনাথ মথুরানাথ মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সিকদার জাহিদ হোসেন, বোড়াশী উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অপর্ণা রায়, প্রথম আলোর গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি নুতন শেখ প্রমুখ।
অধ্যক্ষ মো. আমিনুর রহমান বলেন, শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই মাতৃভূমির জন্ম ও স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানতে পারে, তবে তাদের মনে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। তাই প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো শিশুদের সামনে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা। তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে অভিভাবকদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে। সন্তানের চলাফেরা ও আচরণের প্রতি সব সময় নজর রেখে তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় মোট ৭৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে ৫ জন শিক্ষার্থীকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। হরিদাসপুর রয়েল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাজিদুর রহমান প্রথম, যুগশিখা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাহিয়া ইসলাম দ্বিতীয়, সীতারনাথ মথুরানাথ মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মো. শেখ সামী তৃতীয়, জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মো. তামজিদ আহমেদ (তাসিন) চতুর্থ ও সরসপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের নম্রতা ঘটক (জয়া) পঞ্চম হয়েছে।
গোপালগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বিভিন্ন স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা। রোববার দুপুরে গোপালগঞ্জে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়েপরে বিজয়ীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই উপহার দেওয়া হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল প্রথম আলো বন্ধুসভা গোপালগঞ্জ।
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা চলে না’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শোনা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সকালে পৌর শহরের চন্ডিবের এলাকার ‘ব্লু বার্ড স্কুলে’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছয়টি স্কুল, দুটি কলেজ ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভৈরব কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক। তিনি উপস্থিত নতুন প্রজন্মকে তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার কঠিন সময় ও কয়েকটি অপারেশনের গল্প শোনান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি বেশি বলাবলি না থাকলে দেশের বিপদ বড় হবে। জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কিত হব। অপশক্তির উত্থান ঘটবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বাভাবিক পথ হারাবে।’
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক। রোববার সকালেবীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হক শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ রেখে বলেন, ‘প্লিজ, তোমরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনাকে মেলানোর চেষ্টা কোরো না। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা চলে না, চলতে পারে না। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে বড় ঘটনা দেশে আগেও ঘটেনি, পরেও ঘটেনি।’ তিনি আফসোস করে বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য, পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কিছু নেই। ক্লাসে আলোচনা কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রত্যাশিত কাজ নেই।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কাকলি খেলাঘর আসরের ভৈরব শাখার সাবেক সভাপতি এবং রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান সত্যজিৎ দাস বলেন, ‘আজ শিক্ষার্থীরা খাতা–কলম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি পরীক্ষা দিল। আমার কাছে মনে হয়, এটি কেবল নিছক পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতা নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহা কর্মযজ্ঞ। একাত্তর কখনো কখনো ঝুঁকিতে পড়ে। একাত্তরকে নিরাপদে রাখতে হবে। একাত্তরকে কোনো দলের এজেন্ডা বানানো যাবে না। দলীয় কিংবা ব্যক্তি স্বার্থে একাত্তরের চেতনা কাজে লাগালে বিপদ বাড়বে।’
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের মতো কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়ায় প্রথম আলো ও প্রথম আলো বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানান সত্যজিৎ দাস। তাঁর মতে, প্রথম আলো সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে সিদ্ধহস্ত।
অনুষ্ঠানে ব্লু বার্ড স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা আমিন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ার প্রতি গুরুত্ব দেন। স্কুল-কলেজের পাঠাগারগুলো সক্রিয় করা এবং পাঠাগারের সংগ্রহে মুক্তিযুদ্ধের বই রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানে কুইজে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে ভৈরবের ব্লু বার্ড স্কুলেভৈরব বন্ধুসভার সভাপতি জান্নাতুল মিশুর সভাপতিত্বে এবং সাবেক সভাপতি নাহিদ হোসাইন ও বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে প্রথম আলোর ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা, ভৈরব বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি প্রিয়াংকা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ভুবন আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় ১৩১ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ভৈরব উদয়ন স্কুলের আরাফ চৌধুরী প্রথম, গাজীপুর শাহিন ক্যাডেট একাডেমির মেহেরিন আক্তার দ্বিতীয়, ভৈরব উদয়ন স্কুলের তাসীন মাহমুদ তৃতীয়, এমবিশন পাবলিক স্কুলের ইসরাত জাহান চতুর্থ এবং একই নম্বর পেয়ে যুগ্মভাবে ব্লু বার্ড স্কুলের সামিয়া খানম, জাহিদ মাহমুদ ও রাফসান মিয়া পঞ্চম হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে তাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই দেওয়া হয়। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।