সার্বিয়া ও রেপাবলিকা শ্রপস্কা: বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকারের আখ্যান

· Prothom Alo

জেনোসাইড বা গোষ্ঠীনিধনের মতো অপরাধের বিচার, ঐতিহাসিক স্বীকৃতি এবং স্মৃতিরক্ষা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের এই ধারাবাহিক সিরিজের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত জেনোসাইড এবং এর পরবর্তীকালে তা অস্বীকার করার যে সুগভীর রাজনীতি রয়েছে, তা তাত্ত্বিক ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা। এই পর্বের লেখায় আমরা বসনিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড অস্বীকারের বহুমাত্রিক রূপ এবং এর আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকারের রাজনীতি গভীরভাবে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা অপরিহার্য। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া যুগোস্লাভিয়ার পতনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের নির্বাচনে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতাদের উত্থানের মাধ্যমে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল।

Visit een-wit.pl for more information.

পুরো যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে বসনিয়ার পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি জটিল, কারণ প্রাক্‌-যুদ্ধ বসনিয়ার জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ ছিল বসনিয়াক (বসনিয়ান মুসলিম), ৩১ শতাংশ সার্ব এবং ১৭ শতাংশ ক্রোয়াট। এই বহুজাতিক বৈচিত্র্য একসময় ‘ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য’–এর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর তা রাজনৈতিক সমঝোতাকে অসম্ভব করে তোলে। ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল এক গণভোটের পর বসনিয়ার জাতীয় নেতৃত্ব যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই মূলত যুদ্ধের সূচনা হয়। বসনিয়ান সার্বরা এই গণভোট বর্জন করেছিল এবং সার্বিয়ার সহায়তায় তারা রাজধানী সারায়েভো অবরুদ্ধ করে রাখে, যেখানে খাদ্যাভাবে এবং স্নাইপারের গুলিতে প্রায় ১১ হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

তুরস্ক: আর্মেনীয় জেনোসাইডের সত্য গোপনের আখ্যান

একই সময়ে পূর্ব বসনিয়ায় জাতিগত নিধনের ভয়াবহ রূপ দেখা যায়, যেখানে বসনিয়াক বেসামরিক নাগরিকদের কুখ্যাত সব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে, যখন জেনারেল রাতকো ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন বসনিয়ান সার্ব সেনাবাহিনী জাতিসংঘের ‘সেফ হ্যাভেন’খ্যাত শহর স্রেব্রেনিৎসায় প্রবেশ করে ডাচ শান্তিরক্ষীদের বিনা বাধায় সেখানকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেখানে তারা নারী ও শিশুদের আলাদা করে ১৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৮ হাজার বসনিয়াক পুরুষ ও বালককে কাছাকাছি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করে। অপরাধের প্রমাণ চিরতরে আড়াল করতে তারা রাতের অন্ধকারে গণকবর থেকে মৃতদেহ তুলে অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে দেয়, যাতে মৃতদেহগুলো কখনোই শনাক্ত করা না যায়।

এই যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৯৫ সালের ডেইটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে, যা মূলত সংঘাতকে থামিয়ে দিলেও একটি জটিল সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে দেশকে ‘রেপাবলিকা শ্রপস্কা’ ও ‘বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন’ নামের দুটি পৃথক সত্তায় বিভক্ত করে দেয়। এই যুদ্ধে প্রায় ৯৭ হাজার ১০০ মানুষ নিহত হয়, যাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল বসনিয়াক।

১৯৯৪ সালে এক বৈঠকে বসনিয়ার সার্ব নেতা রদোভান কারাদিচ এবং তাঁর বাহিনীর কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচ। পরে দুজনই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত হন

আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি এবং বসনিয়াকদের রাষ্ট্র গঠনের নৈতিক দাবি

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্রেব্রেনিৎসার এই বিভীষিকাকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০১ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফরমার যুগোস্লাভিয়া (আইসিটিওয়াই) এবং পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) স্রেব্রেনিৎসার এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞকে সন্দেহাতীতভাবে ‘জেনোসাইড’ বা গোষ্ঠীনিধন হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়। আইসিটিওয়াই তাদের রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানায়, স্রেব্রেনিৎসায় বসনিয়ান মুসলিমদের আংশিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই বসনিয়ান সার্ব বাহিনী এই জেনোসাইড সংঘটিত করেছিল। আইসিজে অবশ্য সার্বিয়া রাষ্ট্রকে সরাসরি জেনোসাইডের নির্দেশদাতা হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করেনি, তবে জেনোসাইড প্রতিরোধ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাদের আইনগতভাবে দায়ী করে।

১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল এক গণভোটের পর বসনিয়ার জাতীয় নেতৃত্ব যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই মূলত যুদ্ধের সূচনা হয়। বসনিয়ান সার্বরা এই গণভোট বর্জন করেছিল এবং সার্বিয়ার সহায়তায় তারা রাজধানী সারায়েভো অবরুদ্ধ করে রাখে, যেখানে খাদ্যাভাবে এবং স্নাইপারের গুলিতে প্রায় ১১ হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়গুলো বসনিয়ার যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দেয়। স্রেব্রেনিৎসায় যে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল, এই আইনি স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বসনিয়াকরা ডেইটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট জাতিগত বিভাজনের সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে একটি ঐক্যবদ্ধ ও অখণ্ড বসনিয়া রাষ্ট্র গঠনের জোরালো দাবি তোলে। তাদের এই দাবির মূল ভিত্তি ছিল নৈতিকতা; যেহেতু তারা জেনোসাইডের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র শিকার, তাই রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকতর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকা উচিত এবং একটি অখণ্ড রাষ্ট্র ছাড়া ভবিষ্যতে তাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বসনিয়াক দৃষ্টিকোণ থেকে ডেইটন চুক্তির মাধ্যমে স্রেব্রেনিৎসাকে বসনিয়ান সার্বদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিয়ে তাদের প্রতি চরম অবিচার করা হয়েছে।

কম্বোডিয়া: ‘খেমার রুজ’দের গণহত্যা ও অস্বীকারের কৌশল

রেপাবলিকা শ্রপস্কায় জেনোসাইড অস্বীকার

রেপাবলিকা শ্রপস্কার (আরএস) রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড অস্বীকার মূলত রাষ্ট্র গঠন এবং ভবিষ্যতের স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রেপাবলিকা শ্রপস্কা বসনিয়ার সীমানার ভেতরে একটি সত্তা হলেও তাদের নিজস্ব সংবিধান, পুলিশ বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা সব সময় সার্বিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার অথবা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন লালন করে। তাদের এই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হলো স্রেব্রেনিৎসা জেনোসাইডের দায়। এই দায় এড়াতে ২০০২ সালে তাদের একটি সরকারি প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে স্রেব্রেনিৎসায় মাত্র দুই হাজার বসনিয়াক নিহত হয়েছে এবং নিহত ব্যক্তিরা কেউই বেসামরিক নাগরিক নয়, বরং তারা সবাই সৈন্য ছিল।

পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপের মুখে ২০০৪ সালে তারা একটি কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয় এবং ওই কমিশনের রিপোর্টে সাত হাজার বসনিয়াক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করে তৎকালীন আরএস প্রেসিডেন্ট দ্রাগান চাভিচ একটি ব্যক্তিগত ক্ষমাপ্রার্থনাও করেন।

কিন্তু খুব দ্রুতই এটি প্রমাণিত হয় যে এই স্বীকারোক্তি আন্তরিক ছিল না, বরং এটি ছিল কেবল আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার একটি কৌশল। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে আরএস ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি ২০০৪ সালের সেই ঐতিহাসিক কমিশনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দেয়। এর সূত্র ধরে ২০১৯ সালে তারা উল্টো সার্বদের ভুক্তভোগী হিসেবে প্রমাণের জন্য স্রেব্রেনিৎসা ও সারায়েভোর ঘটনা তদন্তে নতুন করে বিকল্প বা রিভিশনিস্ট কমিশন গঠন করে, যা ইতিহাস বিকৃতির একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা।

বর্তমান বসনিয়া হার্জেগোভিনার স্রেব্রেনিৎসায় গণকবরের স্মৃতিস্তম্ভ

এই অস্বীকারের রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হলেন নেতা মিলোরাদ দোদিক, যিনি প্রকাশ্যে স্রেব্রেনিৎসার জেনোসাইডকে একটি ‘বানোয়াট মিথ’ বা অস্তিত্বহীন ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন। দোদিক বারবার দাবি করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সার্বরা যেহেতু উস্তাশাদের দ্বারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল, তাই তারা ‘গণহত্যাকারী জাতি’ হতে পারে না।

এই অস্বীকার রেপাবলিকা শ্রপস্কার পুরো সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাক্রমে গভীরভাবে প্রোথিত করা হয়েছে। তাদের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে স্রেব্রেনিৎসা জেনোসাইডের কোনো উল্লেখ নেই এবং স্রেব্রেনিৎসায় নির্মিত শান্তির স্মৃতিস্তম্ভেও জেনোসাইডের কোনো স্বীকৃতি নেই। এর পাশাপাশি মুক্তি পাওয়া যুদ্ধাপরাধী রাদোভান কারাদজিক ও রাতকো ম্লাদিচকে বীরের মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের নামে রাস্তার নামকরণ করার মাধ্যমে তারা জেনোসাইডের সত্যতাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করছে। রেপাবলিকা শ্রপস্কার এই সংঘবদ্ধ অস্বীকারের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো নিজেদের একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে বসনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করা।

বসনিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৯৫ সালের ডেইটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে, যা মূলত সংঘাতকে থামিয়ে দিলেও একটি জটিল সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে দেশকে ‘রেপাবলিকা শ্রপস্কা’ এবং ‘বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন’ নামের দুটি পৃথক সত্তায় বিভক্ত করে দেয়। এই যুদ্ধে প্রায় ৯৭ হাজার ১০০ মানুষ নিহত হয়, যাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল বসনিয়াক।

সার্বিয়ায় জেনোসাইড অস্বীকার

সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জেনোসাইড অস্বীকারের রাজনীতি উদ্দেশ্যগতভাবে কিছুটা ভিন্নমাত্রার হলেও এর তীব্রতা কোনো অংশে কম নয়। সার্বিয়া জেনোসাইড অস্বীকারকে ব্যবহার করে মূলত তাদের নিজস্ব জাতীয় বীরত্ব এবং ভুক্তভোগী হওয়ার ঐতিহাসিক আখ্যান টিকিয়ে রাখার জন্য এবং ক্রোয়েশিয়া বা কসোভোর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। সার্বিয়ার রাজনৈতিক নেতারাও অস্বীকারের এক অত্যন্ত সুকৌশলী পথ অবলম্বন করে আসছেন। ২০১০ সালে সার্বিয়ার পার্লামেন্ট স্রেব্রেনিৎসা নিয়ে একটি বিবৃতি পাস করে, যেখানে তারা ট্র্যাজেডি আটকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, কিন্তু অত্যন্ত সুকৌশলে পুরো বিবৃতিতে একবারের জন্যও জেনোসাইড শব্দটি উচ্চারণ করেনি। এটি মূলত ব্যাখ্যামূলক অস্বীকারের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে অপরাধের ভয়াবহ মাত্রাকে একটি সাধারণ ‘জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে লঘুকরণ করে দেখানো হয়েছে।

সার্ব রাষ্ট্রযন্ত্র জেনোসাইডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততাকে অস্বীকার করে পুরো ঘটনাকে কয়েকজন বিপথগামী ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ২০১২ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট তোমিস্লাভ নিকোলিচ সরাসরি মন্তব্য করেন যে স্রেব্রেনিৎসায় আদৌ কোনো জেনোসাইড হয়নি এবং ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রনাবিচও দাবি করেন যে এটি সার্বিয়ার নামে সংঘটিত হয়নি, তাই এটি জেনোসাইড নয়।

সার্বিয়া তাদের এই অস্বীকারের রাজনীতিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে ‘সুবিধাজনক তুলনা’ কৌশল ব্যবহার করে; তারা ক্রোয়েশিয়ার ‘অপারেশন স্টর্ম’–এর সময় সার্বদের জাতিগত নিধনের শিকার হওয়ার বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে ‘অপরাধের সমতা’ প্রমাণের চেষ্টা করে। সার্বিয়ার জেনোসাইড মিউজিয়াম তাদের ‘রিথিংকিং স্রেব্রেনিৎসা’ প্রজেক্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়গুলোকে সার্ববিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করে ইতিহাসও বিকৃত করেছে।

তুরস্ক: আর্মেনীয় জেনোসাইডের সত্য গোপনের আখ্যান
রেপাবলিকা শ্রপস্কা বসনিয়ার সীমানার ভেতরে একটি সত্তা হলেও তাদের নিজস্ব সংবিধান, পুলিশ বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা সব সময় সার্বিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার অথবা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন লালন করে। তাদের এই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হলো স্রেব্রেনিৎসা জেনোসাইডের দায়। এই দায় এড়াতে ২০০২ সালে তাদের একটি সরকারি প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে স্রেব্রেনিৎসায় মাত্র দুই হাজার বসনিয়াক নিহত হয়েছে এবং নিহত ব্যক্তিরা কেউই বেসামরিক নাগরিক নয়, বরং তারা সবাই সৈন্য ছিল।

অস্বীকারের বৈশ্বিক মাত্রা

বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকার কেবল বলকান অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও মতাদর্শগত কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীও এই অস্বীকারের আখ্যানে নিরন্তর ইন্ধন জুগিয়েছে। সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে রাশিয়া ‘প্যান-স্লাভিক’ মিথ ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সার্বিয়ার অপরাধগুলোকে সুকৌশলে আড়াল করার চেষ্টা করে, যার চরম প্রকাশ ঘটে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্রেব্রেনিৎসাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানের মাধ্যমে।

এর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে গবেষক মাইকেল এ সেলসের লেখা ‘দ্য ব্রিজ বিট্রেড: রিলিজিয়ন অ্যান্ড জেনোসাইড ইন বসনিয়া’ (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৯৬) গ্রন্থে।

একইভাবে ধর্মীয় সংহতির কারণে যুদ্ধের সময় বসনিয়ান সার্বদের প্রতি গ্রিসের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের প্রকাশ্য সমর্থন এবং স্রেব্রেনিৎসায় ‘গ্রিক ভলান্টিয়ার গার্ড’-এর সম্পৃক্ততার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দীর্ঘ নীরবতার বিষয়টি অত্যন্ত শক্তভাবে উঠে এসেছে তাকিস মিকাসের সাড়াজাগানো গবেষণা ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স: গ্রিস অ্যান্ড মিলোসেভিচ’স সার্বিয়া’ (টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২) বইটিতে।

সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে রাশিয়া ‘প্যান-স্লাভিক’ মিথ ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান ভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সার্বিয়ার অপরাধগুলোকে সুকৌশলে আড়াল করার চেষ্টা করে, যার চরম প্রকাশ ঘটে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্রেব্রেনিৎসাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানের মাধ্যমে।

বিস্ময়করভাবে পশ্চিমা বিশ্বেও এই জেনোসাইড অস্বীকারের দুটি বিপরীতমুখী কিন্তু শক্তিশালী ধারা লক্ষ করা যায়। একদিকে পশ্চিমা চরম ডানপন্থী এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীগুলো ইসলামোফোবিয়াকে পুঁজি করে রাতকো ম্লাদিচ বা রাদোভান কারাদজিকের মতো দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ‘খ্রিষ্টান ইউরোপের রক্ষক’ হিসেবে মহিমান্বিত করে জেনোসাইডকে ভয়ংকরভাবে বৈধতা দেয়, অন্যদিকে নোয়াম চমস্কির মতো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী বলকানে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের প্রতি অন্ধ বিরোধিতার বশবর্তী হয়ে স্রেব্রেনিৎসার নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং জেনোসাইডের আইনি সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন, যা ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মার্কো আতিলা হোয়ারের বিভিন্ন গবেষণায় তীক্ষ্ণভাবে সমালোচিত হয়েছে। ফলে বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকার স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে একটি জটিল বৈশ্বিক ও মতাদর্শিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

স্মৃতিরক্ষা বনাম বিকৃতি

রাষ্ট্রীয় ও ভূরাজনৈতিক এই কাঠামোগত অস্বীকারের বিপরীতে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা ও গবেষণা ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা ও স্মৃতিরক্ষার এক অত্যন্ত শক্তিশালী রণক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে শিল্পমাধ্যম নিজেই ইতিহাস বিকৃতির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বসনিয়ান পরিচালক ইয়াসমিলা জাবানিচের অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্র ‘কোয়ো ভাদিস, আইদা?’ কিংবা ড্যানিস তানোভিচের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ জেনোসাইডের ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের (বিশেষত ডাচ শান্তিরক্ষীদের) চরম নৈতিক ব্যর্থতাকে বৈশ্বিক দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তুলে সার্বদের ‘নির্দোষ হওয়ার’ মনগড়া আখ্যানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

একইভাবে সাংবাদিক জো সাকোর প্রামাণ্য গ্রাফিক নভেল ‘সেফ এরিয়া গোরাঝদে’ (ফ্যান্টাগ্রাফিকস বুকস, ২০০০) অবরুদ্ধ বসনিয়াকদের মানবিক দুর্দশার যে অকাট্য দলিল তুলে ধরেছে, তা অস্বীকারকারীদের সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক দাবিকে অকার্যকর করে দেয়। এই স্মৃতিরক্ষার লড়াইয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গুরুত্ব অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সারাহ ওয়াগনার তাঁর ‘টু নো হোয়্যার হি লাইজ: ডিএনএ টেকনোলজি অ্যান্ড দ্য সার্চ ফর স্রেব্রেনিৎসাস মিসিং’ (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ২০০৮) গ্রন্থে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ফরেনসিক প্রমাণ জেনোসাইড অস্বীকারকারীদের মিথ্যাচার খণ্ডন করতে সাহায্য করে এবং অধ্যাপক ডেভিড পেটিগ্রু তাঁর গবেষণায় স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে সত্য বাঁচিয়ে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: আদিবাসী নির্মূলের প্রলম্বিত অভিযান

তবে সাহিত্য যে সব সময় কেবল সত্যের পক্ষেই থাকে তা নয়; জেনোসাইড অস্বীকারকারী সার্বীয় আখ্যান অনেক সময় পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও অনাকাঙ্ক্ষিত বৈধতা পেয়ে যায়, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ডকে। তিনি প্রকাশ্যে স্রেব্রেনিৎসায় জেনোসাইডের সত্যতাকে অস্বীকার করেছেন এবং স্লোবোদান মিলোসেভিচের মতো যুদ্ধাপরাধীর শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন, তাকেই ২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলেক্সান্দার হেমন ও স্লাভোয় জিজেকের মতো শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিকেরা একে পশ্চিমা বিশ্বে ‘গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা’ হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে জেনোসাইড অস্বীকার কেবল রাজনৈতিক মঞ্চেই নয়, বরং সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও কতটা সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করতে পারে।

‘কোয়ো ভাদিস, আইদা?’ এবং ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এই সিনেমা দুটি বসনিয়ার জেনোসাইডের ভয়াবহতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চরম নৈতিক ব্যর্থতাকে জীবন্ত করে তোলে

উপসংহার

বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকারের এই বিস্তৃত বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে অতীত ইতিহাস বিকৃতি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রগুলোর সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক কৌশল। এই অঞ্চলে সার্বীয় ও বসনিয়াক জাতীয়তাবাদ মূলত একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। সার্ব নেতারা যখন অবলীলায় জেনোসাইড অস্বীকার করেন, বসনিয়াক নেতারা তখন রেপাবলিকা শ্রপস্কাকে একটি জেনোসাইডের মাধ্যমে সৃষ্ট সত্তা হিসেবে তুলে ধরে তা বাতিলের জোরালো দাবি জানান। আর এই বাতিলের আশঙ্কাই সার্ব জাতীয়তাবাদীদের আরও বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করে, কারণ তারা আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়াকে ভয় পায় এই ভেবে যে জেনোসাইডের আইনি স্বীকৃতি তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। ফলস্বরূপ, রেপাবলিকা শ্রপস্কা জেনোসাইড অস্বীকার করে তাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। অপর দিকে সার্বিয়া নিরন্তর অস্বীকারের মাধ্যমে তাদের সামষ্টিক নির্দোষিতার মিথ বজায় রাখে, যা তাদের অন্যান্য স্থানে সংঘটিত অপরাধের দায় এড়াতে সাহায্য করে। পরিশেষে বলা যায়, বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকার কেবল অতীতের কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ অস্বীকার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হলো রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা, সাংবিধানিক অধিকার এবং নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক সুদূরপ্রসারী হাতিয়ার।

Read full story at source