ইরান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যেভাবে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো জেগে উঠল

· Prothom Alo

২০০৬ সালের হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধের অমীমাংসিত সমাপ্তি ঘটে। তবে সেই যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তৈরি করে দিয়েছিল। কারণ, তখন থেকেই হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা একটি ‘ভবিষ্যৎ যুদ্ধের’ কথা বলে আসছিলেন। সেটি হবে চূড়ান্ত সংঘাত, যেখানে শক্তির ব্যবহারে হিজবুল্লাহর কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। সেই সংঘাত থেকে কেবল একটি পক্ষই বিজয়ী হিসেবে বেরিয়ে আসবে, সেটি হচ্ছে হিজবুল্লাহ।

Visit sportbet.rodeo for more information.

২০২৪ সালে চরম পরীক্ষায় পড়ে যায় হিজবুল্লাহ। সে বছর সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর প্রধান নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা ও ভয়াবহ পেজার হামলা চালিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অনেকটা শক্তিহীন করে ফেলে। এর ধারাবাহিকতায় সে বছর নভেম্বরে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয় হিজবুল্লাহ। যদিও ইসরায়েলই বারবার সে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে। কিন্তু বিপরীতে হিজবুল্লাহ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।

২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড কেবল তেহরানকে নয়, বরং লেবাননের হিজবুল্লাহকেও এক অভূতপূর্ব অস্তিত্বসংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যে সংঘাতকে এত দিন কেবল গাজার ‘সহায়ক ফ্রন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তা এখন হিজবুল্লাহর জন্য এক ‘শেষ যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে।

সবশেষে এই যুদ্ধ শেষে যে হিজবুল্লাহ বেরিয়ে আসবে, তা হবে আরও বেশি বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সম্ভবত আরও বেশি আন্তর্জাতিক শক্তির (যেমন চীন বা রাশিয়া) মেরুকরণে বিশ্বাসী। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা, আর লিতানি নদীর পাড়ে লেখা হচ্ছে আধুনিক ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

খামেনির শাহাদাত: পাল্টে যাওয়া যুদ্ধের ক্যালকুলাস

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ড ছিল মূলত হামাসের সমর্থনে সীমিত পরিসরের। হাসান নাসরুল্লাহ তাঁর জীবদ্দশায় বারবার একে ‘জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, যা কোনো চূড়ান্ত সংঘাত ছিল না। তবে ইরানে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা এবং খামেনির হত্যাকাণ্ড হিজবুল্লাহর সব কৌশলগত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।

হিজবুল্লাহর একজন অভিজ্ঞ সূত্র স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এরপর আর কোনো যুদ্ধ হবে না। হয় আমরা জিতব, নয়তো তারা।’ এ বক্তব্যই প্রমাণ করে, হিজবুল্লাহর কাছে এই লড়াই এখন আর কেবল ভূখণ্ড রক্ষার নয়, বরং তাদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। খামেনি ছিলেন তাদের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক; তাঁর মৃত্যু হিজবুল্লাহর জন্য সব ‘রেড লাইন’ বা লাল সীমা মুছে দিয়েছে।

নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: বাস্তববাদ বনাম আদর্শিক কঠোরতা

হাসান নাসরুল্লাহর নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খায় হিজবুল্লাহ। হাসান নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল হিজবুল্লাহ। তাঁর মৃত্যুতে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে শেখ নাইম কাসেমের মনোনয়ন হিজবুল্লাহর ভেতরে একটি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছিল। কাসেমের নীতিকে বিশ্লেষকেরা ‘ইমাম হাসানের নীতি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

শিয়া ইতিহাসে ইমাম হাসান (রা.) রক্তপাত এড়াতে শান্তিচুক্তি করেছিলেন; অন্যদিকে তাঁর ছোট ভাই ইমাম হোসেন (রা.) কারবালায় শাহাদাতবরণ করেছিলেন। কাসেম চেয়েছিলেন হিজবুল্লাহকে আরও বেশি ‘লেবাননকেন্দ্রিক’ করতে, নাসরুল্লাহর কট্টর সমর্থকদের সরিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিতে এবং লেবানন সরকারের চাপের মুখে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে।

কিন্তু খামেনির হত্যাকাণ্ড কাসেমের এই বাস্তববাদী নীতিকে কোণঠাসা করে দেয়। ২ মার্চ যখন হিজবুল্লাহ হাইফার কাছে ইসরায়েলি ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালায়, তখন জানা যায় যে এই সিদ্ধান্ত হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং সরাসরি ইরানের কুদস ফোর্স এবং হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’-এর সমন্বয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি সংগঠনের ভেতরের এক গভীর ফাটল এবং সামরিক শাখার ওপর ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বহিঃপ্রকাশ।

গেরিলা যুদ্ধে প্রত্যাবর্তন ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব

পশ্চিমা গণমাধ্যম ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করছিল যে হিজবুল্লাহ ‘বিধ্বস্ত ও বিচ্ছিন্ন’। কিন্তু রণক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিজবুল্লাহ এখন তাদের ধ্রুপদি ‘গেরিলা যুদ্ধ’ কৌশলে ফিরে গেছে। যোদ্ধারা এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে বিভক্ত হয়ে লড়ছে, যা ইসরায়েলি বিমান হামলার কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে।

ইসরায়েলি আড়ি পাতা এড়াতে তারা সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার সীমিত করেছে। সবচেয়ে বড় চমক ছিল হিজবুল্লাহর জিপিএস প্রযুক্তিতে পরিবর্তন। মার্কিন জিপিএস জ্যামিং এড়াতে তারা চীনের বেইদু স্যাটেলাইট সিস্টেমে স্থানান্তরিত হয়েছে। ৯ মার্চ এলা ভ্যালিতে করা নিখুঁত মিসাইল হামলা প্রমাণ করেছে যে হিজবুল্লাহর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন ইসরায়েলের আইরন ডোম বা থাড সিস্টেমের চেয়ে দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে।

পশ্চিমা মিডিয়ার বয়ান বনাম ১৫,৪০০ বারের নগ্ন সত্য

বিবিসি, সিএনএন ও অন্যান্য পশ্চিমা করপোরেট গণমাধ্যম হিজবুল্লাহকে ‘যুদ্ধ উসকানিদাতা’ হিসেবে চিত্রিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠান শিরোনাম দিচ্ছে—হিজবুল্লাহ লেবাননকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ বাস্তব তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েল সহস্রাধিকবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। দক্ষিণ লেবাননে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ছিটানো থেকে শুরু করে লেবাননের আকাশসীমা প্রতিদিন লঙ্ঘন করা—ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিকে একতরফা রসিকতায় পরিণত করেছিল। হিজবুল্লাহ দীর্ঘ ১৫ মাস ধৈর্য ধরেছিল কেবল লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার খাতিরে।

অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা: নাওয়াফ সালাম ও নাবিহ বেরি ফ্যাক্টর

হিজবুল্লাহর জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে। লেবাননের মার্কিনপন্থী প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সরাসরি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের মিত্র ও পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরিও এখন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বেরি মনে করছেন, হিজবুল্লাহ তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। আমাল মুভমেন্টের মন্ত্রীদের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া সংগঠনটিকে রাজনৈতিকভাবে একা করে দিয়েছে। লেবাননের বর্তমান অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং এই রাজনৈতিক বিভাজন দেশটিকে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সামরিক সক্ষমতার ‘মিথ’ এবং রাদওয়ান ফোর্সের প্রত্যাবর্তন

ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ২০২৪ সালের পেজার হামলা এবং নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ডের পর হিজবুল্লাহ আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু হিজবুল্লাহর এক লাখ যোদ্ধার বিশাল বাহিনী এবং তাদের দুর্ভেদ্য সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত। বিশেষ করে ‘রাদওয়ান ইউনিট’ আবার দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন হওয়া ইসরায়েলি স্থল বাহিনীর জন্য এক মরণফাঁদ তৈরি করেছে। হিজবুল্লাহর কৌশল হলো ইসরায়েলি বাহিনীকে লেবাননের ভূখণ্ডের যতটা গভীরে সম্ভব টেনে আনা। দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও বনভূমি ট্যাংকবহরের জন্য উপযোগী নয়, যা হিজবুল্লাহর গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য এক বিশাল সুবিধা।

কারবালা চেতনা: মৃত্যু যখন পরম আরাধ্য

হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের কাছে এই যুদ্ধ কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, এটি একটি ধর্মীয় ও আদর্শিক সংগ্রাম। যোদ্ধাদের প্রতি লেখা সাম্প্রতিক চিঠিতে ‘কারবালা’ ও ‘শাহাদতের’ রেফারেন্সগুলো এটাই ইঙ্গিত দেয়, তারা এক আত্মঘাতী বীরত্বের জন্য প্রস্তুত। তারা আমেরিকাকে ‘মহা শয়তান’ ও ইসরায়েলকে ‘ক্যানসারাস টিউমার’ হিসেবে অভিহিত করে লড়ছে। তাদের বিশ্বাস, ইরানের বর্তমান রেজিমের পতন ঘটলে শিয়া আদর্শিক প্রতিরোধক্ষমতা চিরতরে বিলুপ্ত হবে। এই ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ই তাদের ৩০ হাজার অভিজ্ঞ যোদ্ধাকে ফ্রন্টলাইনে অকুতোভয় করে তুলেছে।

এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম

এই যুদ্ধ কখন থামবে বা এর পরিণতি কী হবে, তা বলা মুশকিল। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—হিজবুল্লাহ তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি। যদি হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে ইসরায়েলকে একটি রক্তক্ষয়ী চোরাবালিতে আটকে দিতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছক চিরতরে বদলে যাবে। আর যদি তারা ব্যর্থ হয়, তবে কেবল হিজবুল্লাহ নয়, বরং ইরানের নেতৃত্বাধীন গোটা প্রতিরোধব্যবস্থা এক বিশাল শূন্যতায় নিমজ্জিত হবে।

সবশেষে এই যুদ্ধ শেষে যে হিজবুল্লাহ বেরিয়ে আসবে, তা হবে আরও বেশি বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সম্ভবত আরও বেশি আন্তর্জাতিক শক্তির (যেমন চীন বা রাশিয়া) মেরুকরণে বিশ্বাসী। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা, আর লিতানি নদীর পাড়ে লেখা হচ্ছে আধুনিক ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: [email protected]

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, ল্য মঁদ, আটলান্টিক কাউন্সিল, আই২৪নিউজ

Read full story at source