‘৫৫ বছর হয়ে গেল, কেউ কথা রাখেনি’

· Prothom Alo

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কথা দিয়েছিল যে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে; অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আশ্বাস শোনা গিয়েছিল সমতাভিত্তিক উন্নয়নের। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। লিখেছেন সেলিম জাহান

‘কেউ কথা রাখেনি

Visit asg-reflektory.pl for more information.

তেত্রিশ বছর কাটলো

কেউ কথা রাখেনি’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটার শুরু একটি লাইন দিয়েই। তারপর বর্ণনা আছে, যারা কথা রাখেনি তাদের এবং যে কথাগুলো রাখা হয়নি তার। এক বোষ্টমি গান শুনিয়েছিল আংশিক এবং বলেছিল, পরে এসে অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে। সে আর ফিরে আসেনি। চৌধুরীবাড়ির ছেলেপুলেরা দেখিয়ে দেখিয়ে লাঠি–লজেন্স খেয়েছে, বাবা বলেছিলেন, একদিন সব হবে। সেই বাবা আজ শয্যাশায়ী। মামাবাড়ির নাদের আলী বলেছিল, ‘বড় হও দাদাঠাকুর, তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব’, তিন প্রহরের বিল দেখা হয়নি এবং তেত্রিশ বছর বাদে উত্থাপিত হয়েছে সেই মোক্ষম জিজ্ঞাসা, ‘আমি আর কত বড় হব, নাদের আলী?’

বাংলাদেশের ৫৬তম স্বাধীনতা দিবসে আমার কেন জানি বড় বেশি করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাটি মনে পড়ছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কথা দিয়েছিল যে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে। সমাজকাঠামো কথা দিয়েছিল সে একটি শোষণমুক্ত সমাজের হবে, যেখানে সব মানুষ সমান অধিকার নিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আশ্বাস শোনা গিয়েছিল সমতাভিত্তিক উন্নয়নের এবং বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য উন্নততর জীবন–মানের। সাংস্কৃতিক বলয়ে কথা দেওয়া হয়েছিল যে সৃজনশীলতা, মুক্তবুদ্ধি ও স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে গড়ে তোলা হবে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের জাতিসত্তার গর্বের আধার হবে।

কিন্তু গত ৫৫ বছরের পথপরিক্রমায় এসে আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বড় দুঃখ ও কষ্টে শুধু এটুকুই বলতে পারি, ‘কেউ কথা রাখেনি’। ১৯৭১ সালে ২০ বছর বয়সের যুবক আমার জীবনের এ প্রান্তে এসে ৫৫ বছর বাদে এ প্রশ্ন করা কি সংগত, ‘আমি আর কত বড় হব?’ এবং কাকেই-বা সে প্রশ্ন করব—‘নাদের আলীরা কবিতায়ই থাকে, বাস্তবে নয়।’

গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হোক

২.

কথা দেওয়া হয়েছিল যে সর্ব অর্থেই বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি; শুধু পশ্চিমা গণতন্ত্রের একটি কাঠামো নয়। আমরা সবাই সর্বস্তরে প্রতিনিয়ত গণতন্ত্রের চর্চা করে যাব, আমাদের গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ শুধু নির্বাচন আর সংসদপ্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৃজনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, দায়বদ্ধতা আর ন্যায়বোধের ভিত্তিতে আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য গড়ে তুলব। অথচ আমাদের ৫৫ বছরের ইতিহাস এটা সাক্ষ্য দেয় না যে আমরা আমাদের কথা রাখতে পেরেছি।

রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কথা যদি তুলি, তাহলে গত ৫৫ বছরের একটি বড় সময়েই আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো একনায়কতন্ত্র, সামরিক জান্তা অথবা অন্যান্য অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হয়েছে। সুখের বিষয় এবং স্বস্তির কথা যে বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছুদিনের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সরকারকাঠামো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পেরেছে। নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু এ উত্তরণ পরে আর নিরঙ্কুশ থাকতে পারেনি। সন্ত্রাস, রক্তপাত, অস্থিরতা এবং অর্থবল এসব নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করেছে নানাভাবে, যাদের হাতে আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করেছি, তারা বিশ্বাসযোগ্য কাজ করতে পারেনি। ফলে নানা সময়ে জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন আমরা নির্বাচনী রায়ে প্রতিফলিত হতে দেখিনি।

‘যত মত, তত পথ’ না হোক, নিদেনপক্ষে ‘যত মত, তত শ্রদ্ধাবোধ’—এ ন্যূনতম মূল্যবোধও আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার মত আর পথকেই আমি চূড়ান্ত বলে মনে করেছি, অন্য সব মত আর পথের বিপক্ষে আমরা খড়্গহস্ত হয়েছি, তা নির্মূল করতে তৎপর হয়েছি বারবার। ফলে গণতন্ত্র যে শুধু একটি ধারণা নয়, শুধু একটি ব্যবস্থা নয়, এটা যে নিরন্তর একটি চর্চা, তা আমরা বিস্মৃত হয়েছি।

সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটি সুস্থ আবহাওয়ার অনুপস্থিতিতে আমরা ব্যথিত ও নিরাশ হয়েছি বারবার। সরকারি ও বিরোধী দল নিয়ে যে সরকার—এ অনুপেক্ষ সত্য আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিস্মৃত হয়েছে প্রতিনিয়ত। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদই হচ্ছে চূড়ান্ত স্থান, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা নীতিমালা নিয়ে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনায় বসেন, দেশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেন। আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রায়ই হয়নি।

রাজনৈতিক গণতন্ত্রের একটি দিক হচ্ছে আইনের শাসন। গত ৫৫ বছরে যদি কোনো ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অবক্ষয় ঘটে থাকে, সেটা হচ্ছে আইন ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে আইন গ্রন্থেই আছে, বাস্তবায়নে নেই। ‘বিচারের বাণী’ আজ নিভৃতে নীরবে কেঁদে যাচ্ছে অহরহ। অথচ ৫৫ বছর আগে আমাদের কি এ কথা দেওয়া হয়নি যে আর কিছু না হোক, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুবিচার পাবে।

আজ আইনের স্থান করে নিয়েছে অস্ত্র, শৃঙ্খলার স্থানে এসেছে সন্ত্রাস। ঘরে-বাইরে সব বিরোধ আর মতানৈক্যের নিষ্পত্তি হচ্ছে অস্ত্রের মাধ্যমে এবং সব সমস্যার সমাধান আমরা খুঁজছি সন্ত্রাসের মধ্যে। সমাজের এ ‘অস্ত্রীকরণ’ এবং ‘সন্ত্রাসায়ন’ গণতান্ত্রিক সব মূল্যবোধকে বাধাগ্রস্ত করছে। কিন্তু এমনটা কি কথা ছিল?

বহু ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতার মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও আমরা হেলায় উড়িয়ে ফেলেছি; না ব্যক্তিজীবনে, না পারিবারিক জীবনে, না সামাজিক জীবনের কর্মকাণ্ডে আমরা দৃশ্যমানতাকে সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। আমরা মনে যা ভেবেছি, মুখে তা বলিনি; মুখে যা বলেছি, কাজে তা করিনি; একজন মানুষের দায়বদ্ধতা সবার আগে তার নিজের কাছে—এটা আমরা স্থায়ীভাবে ভুলেছি।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা যে গণতন্ত্রের একটি সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি—না ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে, না সামাজিক অঙ্গনে, না রাষ্ট্রীয় বলয়ে। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর পরমতসহিষ্ণুতাকে আমরা আমাদের সংস্কৃতির অংশ করতে পারিনি। আমরা নিজের কথা শোনাতে যত ব্যস্ত হয়েছি, অন্যের কথা শুনতে ততটা আগ্রহী হইনি।

‘যত মত, তত পথ’ না হোক, নিদেনপক্ষে ‘যত মত, তত শ্রদ্ধাবোধ’—এ ন্যূনতম মূল্যবোধও আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার মত আর পথকেই আমি চূড়ান্ত বলে মনে করেছি, অন্য সব মত আর পথের বিপক্ষে আমরা খড়্গহস্ত হয়েছি, তা নির্মূল করতে তৎপর হয়েছি বারবার। ফলে গণতন্ত্র যে শুধু একটি ধারণা নয়, শুধু একটি ব্যবস্থা নয়, এটা যে নিরন্তর একটি চর্চা, তা আমরা বিস্মৃত হয়েছি।

৩.

সামাজিক বলয়ে আমাদের কথা না রাখার ঝোলাটাও কম ওজনদার নয়। শোষণমুক্ত সমাজের কথা ৫৫ বছর আগে আমরা যখন বলেছিলাম, তখন তার মূল কথা ছিল ধর্ম, জাতি, নারী-পুরুষ এবং আর্থিক অবস্থার নিরিখে বাংলাদেশের সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে। আমাদের বহুত্ববাদই হবে আমাদের শক্তির উৎস। আমাদের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বৈষম্য থাকবে না, আমাদের ব্যক্তি-বিশ্বাস থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় দলন থাকবে না। এর ভিত্তিতেই কথা দেওয়া হয়েছিল যে বাংলাদেশে ধর্ম হবে মানুষের একান্ত অন্তরের বিশ্বাস, তার ব্যক্তিগত আচরণের নির্দেশনা; কিন্তু তা রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকে নির্ধারণ করবে না।

এ কথাও আমরা বলেছিলাম যে ধর্মমত–নির্বিশেষে সব মানুষের জীবন, সম্মান ও স্বার্থ এ দেশে সংরক্ষিত। এ লজ্জা আমরা রাখি কোথায় যে ধর্মবিশ্বাসের কারণে বারবার এ দেশের সংখ্যালঘুরা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের নিজের দেশে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা যায়নি, তাঁদের সম্পত্তি তাঁদের হাতছাড়া হয়েছে, তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাঁদের ওপর নেমে এসেছে চরম নির্যাতন। তাঁরা জীবন হারিয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এবং হারিয়েছেন তাঁদের সম্মান।

গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের নারীরা অভূতপূর্বভাবে এগিয়ে গেছেন বহু বিষয়ে। কিন্তু এরপরও অস্বীকার করার উপায় কোথায় যে বহু ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ সমতা এখনো অর্জিত হয়নি। বৈষম্য রয়েছে অর্থনৈতিক সুযোগ লাভে, সম্পদ সৃষ্টির সুযোগে, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে। সমতা আজও অর্জিত হয়নি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে, মজুরি ও আয়ের ক্ষেত্রে কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ডে।

এরপরও দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার পুরুষ-পক্ষপাত এখনো সুস্পষ্ট, বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি বৈষম্য এখনো উপস্থিত। অস্বীকার করার কি উপায় আছে যে গৃহস্থালি সহিংসতার ক্ষেত্রে কিংবা যৌন উৎপীড়নের ক্ষেত্রে নারীরাই মূল শিকার সর্বদাই। নারী-পুরুষের সমতা সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে কথা ৫৫ বছর আগে উচ্চারিত হয়েছিল, তা সর্বতোভাবে অর্জন করা যায়নি।

৪.

সমাজবলয়ে আমরা ভেবেছিলাম যে শিক্ষা অর্জন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার হবে, শিক্ষা হবে বিজ্ঞানসম্মত, সমকালোপযোগী ও গণমুখী। কিন্তু কোথায় আমরা আজ? হাজার হাজার টাকার কোচিং—যেখানে বিজ্ঞানমনস্কতার চিহ্নমাত্র নেই। সুশিক্ষা আজ বিলাসসামগ্রী এবং সেখানে বিত্তবানদেরই প্রবেশাধিকার আছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা স্তরের বিভাজন উচ্চপর্যায়ের এবং সে বিভাজনের কারণে সমাজে শ্রেণিবিভাজন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও গভীর হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণের ফলে শিক্ষা হয়ে উঠেছে ক্রমাগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে। অথচ ৫৫ বছর আগে কথা হয়েছিল যে শিক্ষা অঙ্গনকে মুক্তধারা ও মুক্তচিন্তার ক্ষেত্রভূমি করা হবে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি থাকবে, যার মধ্যে থাকবে সৃজনশীলতা, গতিময়তা, গণমুখিতা; শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক ব্যবস্থার লেজুড়বৃত্তি করবে না।

মোটাদাগে অর্থনৈতিক নির্দেশকের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বেশ কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সে উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের কাছে? অর্থনৈতিক সম্পদ ও সুযোগে দরিদ্র মানুষের অধিকার কতখানি নিশ্চিত করা গেছে? ধনী কর্তৃক দরিদ্রের শোষণ কতটা রোধ করা গেছে? সমাজে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য কি বেড়েছে? দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালায় নগরকেন্দ্রিকতা কি তীব্র নয়?

সব মিলিয়ে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানকে প্রত্যাশিতভাবে উন্নীত করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কোনো ভূমিকা নেই। বিনিয়োগের সুযোগ—তা সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেই হোক কিংবা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই হোক, সেটা সীমাবদ্ধ থেকেছে সম্পদশালীদের মধ্যেই। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র অর্জিত হয়নি, শোষণ রয়েছে আগের মতোই—শুধু তার পদ্ধতি আর রূপ পাল্টেছে।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে সৃজনশীলতা, মুক্তবুদ্ধি আর চিন্তা এবং স্বাধীন মনন প্রত্যাশিত ছিল, তা ঘটছে কই? সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব একদিকে যেমন লক্ষ করছি, তেমনি অপসংস্কৃতির হাস্যকর অনুকরণও ঘটছে প্রতিনিয়ত। যে সংস্কৃতি মানুষকে শাণিত করে, যা মানুষকে উন্নত করে, সে সংস্কৃতি কোথায়? কথা দেওয়া হয়েছিল বারবার যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো হবে জনগণের—সৃজনশীলতা, স্বায়ত্তশাসন আর গণমুখিতা হবে তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সরকার এসেছে, সরকার গেছে—কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন শুধু তাদের মননশীল সৃষ্টিশীলতার জন্যই প্রয়োজনীয় নয়, এটা অত্যাবশ্যক শর্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্যও। গণমাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন গণতান্ত্রিক মুক্তির পথে একটি বিরাট অগ্রগতি।

৫.

গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভঙ্গকারী রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, অর্থনৈতিক কাঠামো নয়—সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ভঙ্গকারী আমরা, ব্যক্তিমানুষেরা। ১৯৭১ সালে আমরা, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মানুষেরা, দৃঢ়ভাবে শপথ নিয়েছিলাম যে এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করব, এ দেশকে গড়ে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করব। আমরা তো সে কথা রাখিনি। ব্যক্তিগত আর গোষ্ঠীগতভাবে আমরা শক্তির কাছে, অর্থের কাছে, জীবনের মোহের কাছে পরাজিত হয়েছি। দেশের কাছে, মানুষের কাছে, সময়ের কাছে আমরা যে কথা দিয়েছিলাম, তা আমরা রাখিনি।

৫৫ বছর আগে যে কথা দেওয়া হয়েছিল, তা রক্ষার এবং বাস্তবায়নের সময় এখনো আছে—ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য। প্রার্থনা করি যে আজকের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কোনো আগামীতে মিথ্যা হয়ে যাবে এবং উচ্চারিত হয়ে উঠবে একটি আনন্দঘন স্মৃতি—‘ওরা কথা রেখেছিল’।

  • সেলিম জাহান জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source