হামে মৃত্যুর ১৮% বরগুনায়, কোথাও স্কুলের বারান্দায় টিকাদান, কোথাও বন্ধ চারটার আগেই
· Prothom Alo
দেশে হামের সংক্রমণের হার ১৬ দশমিক ৮। বরগুনা সদরে এই হার ২৯৪ দশমিক ৫। এত ব্যাপক সংক্রমণ দেশে আর কোথাও নেই।
বরগুনা সদর হাসপাতাল টিকাকেন্দ্রে গতকাল রোববার সকাল আটটায় হাম–রুবেলার টিকা দেওয়া শুরু হয়। কেন্দ্রটি বিকেল চারটার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। কেন বন্ধ হয়ে যায়—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কোনো কর্মীকে বিকেল পৌনে চারটায় পাওয়া যায়নি।
Visit tr-sport.bond for more information.
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের হাম–রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কেন্দ্রগুলো খুলবে প্রতিদিন সকাল আটটায়, চলবে বিকেল চারটা পর্যন্ত। চারটার সময় কোনো শিশুকে টিকা দেওয়া হলে ওই কেন্দ্র আরও আধা ঘণ্টা খোলা থাকবে শিশুটিকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য।
ছোট টিকাদান কক্ষেও জনাবিশেক মানুষের ঠেলাঠেলি। এর মধ্যে ছয়জন নার্স শিশুর নাম লেখা, আগে টিকা দিয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা, তালিকায় নাম তোলা, ভায়াল ভাঙা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত। মা–বাবারা আছেন কয়েকজন, সঙ্গে একটি করে শিশু। আর আছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় তুলনামূলকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিয়েছে। ইপিআইয়ের হিসাবে সারা দেশের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বরগুনা সদর উপজেলায়। অথচ এখানে টিকা দেওয়ার আয়োজনে ঘাটতি দেখা গেছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই।
বরগুনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ প্রথম আলোকে বলেন, এ বছর জেলায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৪০ জন। এর মধ্যে ৩৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। তিনজন মারা গেছে। অন্যরা সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম আলোকে জানিয়েছে, দেশে হামের সংক্রমণের হার ১৬ দশমিক ৮। এর অর্থ দেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১৬ দশমিক ৮ জন হামে আক্রান্ত। অন্যদিকে ইপিআই জানিয়েছে, বরগুনা সদরে হামের সংক্রমণের হার ২৯৪ দশমিক ৫, অর্থাৎ বরগুনা সদরে প্রতি ১০ লাখে সংক্রমণ ঘটেছে ২৯৪ দশমিক ৫ জনের। এত ব্যাপক সংক্রমণ দেশে আর কোথাও নেই।
সরেজমিনে টিকাকেন্দ্র
গতকাল সকাল ১০টায় বরগুনা সদর হাসপাতালে গিয়ে মানুষের ভিড় দেখা যায়। এমন ভিড় প্রায় প্রতিদিনই থাকে। হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচে টিকাকেন্দ্র, সেখানেও ভিড়। ছোট টিকাদান কক্ষেও জনাবিশেক মানুষের ঠেলাঠেলি।এর মধ্যে ছয়জন নার্স শিশুর নাম লেখা, আগে টিকা দিয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা, তালিকায় নাম তোলা, ভায়াল ভাঙা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত। মা–বাবারা আছেন কয়েকজন, সঙ্গে একটি করে শিশু। আর আছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
টিকা নিতে আসা শিশু তৌহিদের বয়স দেড় বছর। মায়ের কোলে বসে ছিল। মা ওকে নিয়ে এসেছে ৪ নম্বর কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়ন থেকে। বেশ হাসিখুশি ছিল। পায়ে টিকা দিতেই সে কী চিৎকার। টিকা দেওয়া শেষ হওয়ার দু–তিন মিনিটের মধ্যে কান্না থামে। মা তাকে নিয়ে চলে যান। আসে আরও একটি শিশু। এভাবে একটির পর একটি শিশুকে টিকা দেওয়া চলতে থাকে। তখন পর্যন্ত ৪০টি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। সারা দিনে ওই কেন্দ্রে ২১৮টি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
ওই হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলায় হামের রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড করা হয়েছে। ওয়ার্ডে গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াতে নিয়ন্ত্রণ বা কড়াকড়ি চোখে পড়ল না।
পাশের শয্যায় ঘুমিয়ে ছিল তাহসিন। বয়স এক বছর। পাশে বসে ছিলেন তার নানি। নানি বলেন, তাহসিনের জ্বর–সর্দি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জ্বর ভালো হওয়ার আগেই তাহসিনের হাম দেখা দেয়। তাহসিনের নানির ধারণা, হাসপাতাল থেকেই হামের সংত্রমণ ঘটেছে।
মুসার বয়স ছয় মাস। মুসাকে নিয়ে বসে আছেন তার মা নূপুর, বয়স ২৮। তাঁদের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নে। নূপুর বলেন, মুসা দ্বিতীয় সন্তান। তাঁদের এলাকার আর কোনো শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর তিনি শোনেননি। কোথা থেকে হাম হয়েছে, তা–ও নূপুর বুঝতে পারছেন না। তিনি নিজে হামের টিকা নিয়েছেন কি না, মনে করতে পারেন না। মুখজুড়ে তাঁর দুশ্চিন্তার ছায়া।
পাশের শয্যায় ঘুমিয়ে ছিল তাহসিন। বয়স এক বছর। পাশে বসে ছিলেন তার নানি। নানি বলেন, তাহসিনের জ্বর–সর্দি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জ্বর ভালো হওয়ার আগেই তাহসিনের হাম দেখা দেয়। তাহসিনের নানির ধারণা, হাসপাতাল থেকেই হামের সংত্রমণ ঘটেছে।
টিকাকেন্দ্রে ও হাসপাতালে বেশ কয়েকজন মা–বাবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, হাম নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। কিন্তু শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে অমনোযোগী বা উদাসীন। কেউ কেউ বলতেই পারেননি তাঁর শিশুকে আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল কি না।
হাম-রুবেলার টিকাদানের প্রথম দিন ছিল গতকাল। চাহিদার তুলনায় টিকা কম থাকায় শিশু-অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকার অপেক্ষায় থাকতে হয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পাবনা সদর উপজেলার চরঘোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠেমোহাম্মদ মামুনের সঙ্গে দেখা হয় চরকলোনি হামিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় টিকাকেন্দ্রের সামনে। তিনি চার বছর বয়সী ছোট মেয়েকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছিলেন। ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি, এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘দেওয়া হয়নি আরকি’।
বেলা সাড়ে তিনটায় চরকলোনি হামিদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনজন টিকাকর্মীকে দেখা যায়। কোনো চেয়ার–টেবিল ছিল না। বিদ্যালয়ের বারান্দার দেয়ালকেই তাঁরা চেয়ার–টেবিল বানিয়ে সারা দিন কাজ করছিলেন। টিকাকর্মীরা জানান, প্রথম দিন তাঁদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২০ জনকে টিকা দেওয়ার। তখন পর্যন্ত ১১০টি শিশু টিকা নিতে এসেছিল, অর্থাৎ প্রথম দিনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।
এর আগে বেলা তিনটায় বরগুনা পৌর কার্যালয়ের টিকাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল এই জেলায় ১ হাজার ৮৮৪টি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
টিকাকর্মীরা জানান, প্রথম দিন তাঁদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২০ জনকে টিকা দেওয়ার। তখন পর্যন্ত ১১০টি শিশু টিকা নিতে এসেছিল, অর্থাৎ প্রথম দিনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।
মানুষ জানে না
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা সদর উপজেলা ও বরগুনা পৌরসভায় ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী ২৭ হাজার শিশুকে হাম–রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সদর উপজেলার ১৫টি ও পৌরসভার ৫টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে ভিড় না থাকার একটি কারণ, অনেক অভিভাবক জানেন না যে হামের জরুরি টিকা কর্মসূচি চলছে। শহরে কোথাও কোনো ব্যানার বা ফেস্টুন চোখে পড়ল না। শহরে মাইকিংও করা হয়নি। আবার একটি কেন্দ্রে দেখা গেছে চেয়ার–টেবিলও নেই।
এসব অভিযোগে জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে জরুরি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রচার করা হবে। সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে দূর করা হবে।
গতকাল বেলা ১১টায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে জেলা সিভিল সার্জন আবুল ফাত্তাহ বলেন, গত বছর এ জেলায় ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু দেখা দিয়েছিল। এ বছর দেখা দিয়েছে হাম। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার শিক্ষা হামের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা অভিযোগ করেন, জেলায় জরুরি কর্মসূচি নিয়ে কী হচ্ছে, তা নিয়ে মানুষ ও সাংবাদিকেরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কতটি কেন্দ্রে টিকা পাওয়া যাবে, কখন টিকাকেন্দ্র খুলবে, জরুরি কর্মসূচি কদিন চলবে, তা মানুষ জানে না। এ বিষয়ে কোনো প্রচার নেই।
এসব অভিযোগে জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে জরুরি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রচার করা হবে। সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে দূর করা হবে।
তিনজনের মৃত্যু বরগুনায়
গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র জানিয়েছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ৫টি শিশু আছে। এর মধ্যে তিনজন বরগুনার। এর অর্থ এখন পর্যন্ত দেশে মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশ হয়েছে এই ছোট জনপদে।
জেলা সিভিল সার্জন জানান, এই তিনটি শিশুর একটি পাথরঘাটা উপজেলার, অন্য দুটি সদর উপজেলার। তাদের একজন মারা গেছে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও অন্যজন মারা গেছে বরিশাল শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।