মৃত্যু উপত্যকার মুখে আবারও কি ‘ভুল’ করছে পেন্টাগন?
· Prothom Alo

সাম্প্রতিক কিছু সংবাদ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। খবর আসছে যে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের অত্যন্ত শক্তিশালী দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) পারস্য উপসাগরের দিকে রওনা দিয়েছে। এর মধ্যে একটি ইউনিট আসছে সান ডিয়েগো থেকে এবং অন্যটি জাপানের ওকিনাওয়া থেকে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত দুই থেকে তিন হাজার সেনা রয়েছে।
Visit esporist.com for more information.
আকারে আমাদের দেশের একটি সামরিক ব্রিগেডের সমান হলেও এদের রণক্ষমতা ও মারণাস্ত্রের সংস্থান চমকে দেওয়ার মতো। ভারী কামান, আধুনিক হেলিকপ্টার, শক্তিশালী মিসাইল এবং হোভারক্র্যাফটের পাশাপাশি এই বাহিনী এফ ৩৫ সি বিমানের আকাশপথের সুরক্ষা পায়।
উল্লেখ্য, এই বিমানগুলো সরাসরি উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম বিধায় এদের জন্য বিশাল রানওয়ের প্রয়োজন হয় না। মেরিন কোরের এ ধরনের মোট সাতটি ইউনিটের মধ্যে দুটিরই অবস্থান এখন পারস্য উপসাগরের দিকে। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র খারাগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই সম্ভবত এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য।
ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুলএকই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে আসছে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের পাঁচ হাজার সেনার একটি ব্রিগেড, দুটি রেঞ্জার ব্যাটালিয়ন এবং দুটি পূর্ণাঙ্গ আর্মি ডিভিশন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার সেনা সেখানে জমায়েত করা হচ্ছে। আকাশপথে শত্রুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা কিংবা কমান্ডো অপারেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু দখল করায় এই বাহিনীর বিশেষ মুনশিয়ানা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে পেন্টাগন আসলে কোন লক্ষ্য অর্জনে এই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
ইরানের ভৌগোলিক আয়তন, জনসংখ্যা এবং নিয়মিত ও অনিয়মিত সেনা সংখ্যার বিপরীতে এই ৭০ হাজার সৈন্যের শক্তি নেহাতই অপ্রতুল বলে মনে হয়। ইরানের রুক্ষ এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্যই অত্যন্ত বৈরী ও কঠিন।
আশা করি মার্কিন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেবে। যথাযথ বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়ে তারা নিজের দেশের সেনাদের এমন এক মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেবে না, যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ঐতিহাসিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এমন দুর্গম ভূখণ্ডে অতি আধুনিক সামরিক সরঞ্জামও অনেক সময় কার্যকর প্রমাণিত হয় না। রাজনৈতিক মহলে বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বের কিছু সিদ্ধান্তের পেছনে উগ্র মানসিকতা কাজ করছে কি না, তা নিয়ে খোদ পশ্চিমা বিশ্বেই নানা সংশয় দেখা দিয়েছে। সমরবিশারদ ও জেনারেলরা কি পরিস্থিতির ভয়াবহতা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছেন না? এটি আত্মঘাতী কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াবে না তো?
এই পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের কম্বোডিয়ার কোহ টাঙ্গ দ্বীপের স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়া অমূলক নয়। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সে সময় যে অপারেশন চালানো হয়েছিল, তাতে মার্কিন মেরিনদের চরম বিপর্যয় ঘটেছিল। নয়টি হেলিকপ্টার ধ্বংসসহ কয়েক ডজন সেনা প্রাণ হারান। সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ছিল তিনজন মেরিন সেনাকে সেই দ্বীপে ফেলে আসা, যাঁদের পরবর্তী সময়ে কম্বোডিয়ানরা হত্যা করে। ইরানের উপকূলে একই ধরনের হঠকারী অভিযান শুরু করলে তা দ্বিতীয় কোনো কোহ টাঙ্গ ট্র্যাজেডির জন্ম দিতে পারে।
অপ্রতিসম যুদ্ধ: ইরানের রণকৌশল থেকে আমাদের যা শিক্ষণীয়সংশ্লিষ্ট সিনেটরদের কেউ কেউ প্রায় প্রতিদিনই মিডিয়ায় এসে রক্তপিপাসু বক্তব্য দিচ্ছেন। তাঁদের ধারণা মেরিনরা অনায়াসেই ইরানি দ্বীপগুলো দখল করে নিতে পারবে। অথচ রণপ্রস্তুতি নিয়ে পাল্টা যুদ্ধের শপথ নিয়ে আছে ইরানি সেনারা। তাদের দেশপ্রেম ও প্রতিরোধের সংকল্পকে কেবল ফায়ার পাওয়ার দিয়ে পরিমাপ করা বিপজ্জনক ভুল হবে। সাধারণ সেনারা লড়বে, কেননা লড়ে যাওয়াই তাদের পেশাগত দায়িত্ব। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর আদেশ অমান্য করবে না, কিন্তু ভুল পরিকল্পনার বলি হবে তারা।
বিখ্যাত কবি আলফ্রেড টেনিসনের ‘চার্জ অব দ্য লাইট ব্রিগেড’ কবিতার সেই ধ্রুপদি চরণগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেখানে কবি লিখেছিলেন, কোনো এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সামনে এগিয়ে যাওয়া অশ্বারোহী সৈন্যরা জানত যে তাদের সামনে নিশ্চিত মৃত্যু। সৈনিকের কাজ কোনো যুক্তিতর্ক করা নয়, তাদের কাজ আদেশ মেনে লড়াই করা এবং প্রয়োজন হলে মৃত্যুবরণ করা। এভাবেই তারা মৃত্যুর উপত্যকায় যাত্রা করেছিল।
আশা করি মার্কিন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেবে। যথাযথ বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়ে তারা নিজের দেশের সেনাদের এমন এক মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেবে না, যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ঐতিহাসিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। নিরপরাধ সেনাদের প্রাণ ও আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার খাতিরে শুভবুদ্ধির জয় হোক।
তুষার কান্তি চাকমা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার)
*মতামত লেখকের নিজস্ব