কায়রোর রমজানে মেসহারাতির অমর ডাক, নিদ্রিত নগরীর হৃৎস্পন্দন

· Prothom Alo

রাতেরও একটি ইতিহাস থাকে। দিনের কোলাহল স্তিমিত হলে, যখন কায়রোর আকাশে রমজানের নরম অন্ধকার নেমে আসে, তখন শহরটি যেন অন্য এক সত্তায় রূপ নেয়। মিনারের ছায়া লম্বা হয়, ফানুসের আলো দুলতে থাকে, আর পুরোনো ইট-পাথরের দেয়ালগুলো নিঃশব্দে বহন করে শতাব্দীর স্মৃতি। ঠিক এমন এক সময়, দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের মৃদু, ছন্দময় ধ্বনি। শব্দটি ক্ষীণ, অথচ গভীর যেন নিদ্রিত নগরীর হৃৎস্পন্দন।

তিনি এগিয়ে চলেন সরু অলিগলি পেরিয়ে। পরনে ঢিলেঢালা গালাবিয়া, মাথায় টাকিয়া, হাতে ছোট একটি ঢাক। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় চিরচেনা আহ্বান ‘হে নিদ্রিত মানুষ, জেগে ওঠো, চিরস্থায়ীর ইবাদতে ফিরে এসো।’ তিনি মেসহারাতি। তাঁর কাজ মানুষকে সাহ্‌রির জন্য জাগানো। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি শুধু একটি সময়স্মারক নয়, তিনি এক জীবন্ত ঐতিহ্য, এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা সাহাবিদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত রমজানের রাতকে আলাদা এক মর্যাদায় অলংকৃত করে রেখেছে।

Visit orlando-books.blog for more information.

ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে, সাহ্‌রির জন্য মানুষকে জাগানোর রীতি ছিল সরল ও মানবিক। কণ্ঠের আহ্বানেই মানুষকে সতর্ক করা হতো। সেই রীতিই সময়ের প্রবাহে মিসরের মাটিতে এসে পায় এক স্বতন্ত্র নগররূপ। ফাতেমি যুগে এই প্রথা আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে, রাতের প্রহরীরা ঘরে ঘরে কড়া নেড়ে মানুষকে জাগাত। পরে সেই কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকের তাল, ছন্দময় হাঁক, নাম ধরে ডাকার আন্তরিকতা।

রমজানের রাত তখন আর নিছক অন্ধকার থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল সুরের আলোকমালা।

মামলুক আমলে মেসহারাতি এক নান্দনিক রূপ লাভ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে শিল্পী ও সমাজসচেতন প্রহরী। তাঁর সুরেলা কণ্ঠে ছিল নাশিদের আবেশ, তাঁর আহ্বানে ছিল দোয়ার উষ্ণতা। তিনি মানুষকে জাগাতেন, আবার তাদের সঙ্গে এক অদৃশ্য সামাজিক বন্ধনও গড়ে তুলতেন। রাতের গভীরতায় তাঁর পদচারণা জানিয়ে দিত এই নগরীতে কেউ একা নয়।

পুরোনো কায়রোর ফাতেমি অলিগলিতে দাঁড়িয়ে যখন গভীর রাতে সেই ঢাকের ধ্বনি শুনি, মনে হয় সময় স্তরভেদ করে কথা বলছে। তারাবিহর নামাজ শেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপে ডুবে থাকা মুহূর্তে হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে সেই চেনা তাল।

অটোমান আমল পেরিয়ে আধুনিকতার বিস্ফোরক যুগেও এই ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। আজকের পৃথিবীতে অ্যালার্ম ঘড়ি, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল অ্যাপ মুহূর্তেই মানুষকে জাগাতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির সেই শব্দ যান্ত্রিক, তার ভেতরে নেই কোনো মানবিক উষ্ণতা। মেসহারাতির ঢাকের শব্দ তাই কার্যকারিতার চেয়ে বেশি কিছু এটি স্মৃতির সুর, আধ্যাত্মিকতার আহ্বান, এক শহরের আত্মপরিচয়ের ভাষা।

পুরোনো কায়রোর ফাতেমি অলিগলিতে দাঁড়িয়ে যখন গভীর রাতে সেই ঢাকের ধ্বনি শুনি, মনে হয় সময় স্তরভেদ করে কথা বলছে। তারাবিহর নামাজ শেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপে ডুবে থাকা মুহূর্তে হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে সেই চেনা তাল। এক বছর পর আবার ফিরে এসেছে। মনে হয়, রমজান কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়, এটি স্মৃতির পুনর্জাগরণ। এই শহর তার অতীতকে বিস্মৃত হয়নি; বরং রাতের নীরবতায় তা উচ্চারণ করে চলেছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মেসহারাতির পোশাকও যেন একটি চলমান প্রতীক। তাঁর সরল গালাবিয়া নগরের আড়ম্বরকে অতিক্রম করে যায়। তাঁর হাতে ছোট ঢাক কোনো আধুনিক যন্ত্র নয়, অথচ তার তালে পুরো পাড়া সাড়া দেয়। সেই শব্দে কোলাহল থেমে যায় না, বরং কোলাহলের মধ্যেই একধরনের সুশৃঙ্খল বিরতি তৈরি হয়। মানুষ জানে, এখন সাহ্‌রির সময় ঘনিয়ে এসেছে শরীরকে জাগাতে হবে, আত্মাকেও প্রস্তুত করতে হবে।

এই ঐতিহ্যের ভেতরে একটি গভীর সামাজিক মাত্রাও আছে। মেসহারাতি কেবল দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি এক সামাজিক আস্থার অংশ। পবিত্র রমজান শেষে মানুষ তাকে খেজুর, খাদ্য বা সামান্য অর্থ দিয়ে সম্মান জানায়। এটি পেশাগত লেনদেনের সম্পর্ক নয়, এটি পারস্পরিক কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, এটি সামাজিক সংহতিরও সময়।

আল-আজহারের সাদা উঠানে ইফতার, এক উম্মাহর নিঃশব্দ মিলন

আজকের দ্রুতগতির নগরে যেখানে স্মৃতি প্রায়ই বিলুপ্তির পথে, সেখানে মেসহারাতির পদচারণা এক প্রতিরোধের ভাষা। এটি বলে ঐতিহ্য কেবল জাদুঘরে সংরক্ষিত বস্তু নয়, তা জীবন্ত মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকে। সাহাবিদের আমলের মানবিক আহ্বান আজও কায়রোর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, বিশ্বাসের উত্তরাধিকার প্রযুক্তির চেয়ে দীর্ঘজীবী।

রমজানের রাত তাই কায়রোতে নিছক সময়ের পরিমাপ নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। ঢাকের মৃদু আওয়াজে জেগে ওঠা মানুষ কেবল সাহ্‌রির প্রস্তুতি নেয় না, সে ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হয়। অতীত ও বর্তমানের মাঝে যে অদৃশ্য সেতু, মেসহারাতির ডাক সেই সেতুকেই দৃশ্যমান করে তোলে।

নিদ্রিত নগরীর ভেতর যে সুর বেজে ওঠে, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ঐতিহ্য হারিয়ে যায় না, যদি মানুষ তা বাঁচিয়ে রাখে। কায়রোর রমজানে মেসহারাতির ঢাক তাই শুধু একটি শব্দ নয়, এটি এক শহরের আত্মার অমলিন স্পন্দন, যা শতাব্দী পেরিয়েও থামেনি, থামবে না।

*লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিসর

Read full story at source