৪০ শয্যার বিপরীতে ১৬৪ শিশু ভর্তি, কুমিল্লা মেডিকেলে মেঝেতেই চিকিৎসা
· Prothom Alo
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে তীব্র শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। ৪০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি আছে ১৬৪টি শিশু। জায়গার অভাবে মেঝেতেই গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসা। হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের সংখ্যা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালের মূল ভবনের নিচতলার ২ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মানসিক চিকিৎসা ওয়ার্ড এখন শিশু বিভাগের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। করিডোরজুড়ে মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতরে কয়েকটি শয্যা থাকলেও অধিকাংশ শিশুর ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। ওই ওয়ার্ডের একটি ছোট কক্ষকে আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের রাখা হয়েছে। আনুমানিক ২০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে ১৭ শিশুর চিকিৎসা চলছে, তবে সেখানে কোনো শয্যা নেই। ফলে গাদাগাদি পরিবেশে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশুদের। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন তাঁদের মা-বাবা ও স্বজনেরা।
Visit casino-promo.biz for more information.
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১৮ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভর্তি করা শুরু হয়। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মোট ২৭টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ১৭টি শিশু আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকেরা গাদাগাদি পরিবেশের মধ্যেই রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। বিভাগীয় প্রধান মিয়া মনজুর আহমেদের নেতৃত্বে চিকিৎসকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। সংকটের কারণে চিকিৎসা দিতে তাঁদেরও বেগ পেতে হচ্ছে।
উপজেলা ও জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা স্বজনেরা এই পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে আছেন বলে জানিয়েছেন। কুমিল্লা নগরের নোয়াগাঁও থেকে ১ বছর বয়সী শিশু রোজাকে নিয়ে এসেছেন মা হালিমা আক্তার। ঈদের পরদিন থেকে শিশুটির জ্বর শুরু হয়। এর পর থেকে ধীরে ধীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তিন দিন আগে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে ভর্তি করেন মা হালিমা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুস্থ মেয়েটার হঠাৎ করেই জ্বর আসে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে দেখি তার শরীরে হামের লক্ষণ। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি। এখানে আসার পর দেখি সিট নেই, ফ্লোরে চিকিৎসা চলছে। মেডিকেল কলেজে বড় ডাক্তার আছেন, এ জন্য কষ্ট করে হলেও মেয়ের চিকিৎসা করাচ্ছি। আগের চেয়ে মেয়েটা এখন একটু ভালো আছে।’
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ এলাকা থেকে এক বছরের শিশু নাজিফা ইসলামকে নিয়ে এসেছেন মা নাহিদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ থাকা শিশুদের একটু ভালো পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া দরকার। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেন সেদিকে গুরুত্ব দেয়—আমরা সেই দাবি জানাই। মানুষ বাধ্য হয়ে আসে, এখানে আসলে চিকিৎসার কোনো পরিবেশ নেই।’
চিকিৎসকেরা গাদাগাদি পরিবেশের মধ্যেই রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। সংকটের কারণে চিকিৎসা দিতে তাঁদেরও বেগ পেতে হচ্ছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তোলাজেলার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশু আদিল আহমেদকে নিয়ে এসেছেন মা সুমনা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ছেলের জ্বর শুরু হয়। এরপর শরীর ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। গতকাল সোমবার থেকে বাচ্চার শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। গত দুই দিন চোখ খোলেনি। আজকে বাচ্চাটা চোখ মেলেছে। এখানে চিকিৎসা নেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এরপরও কষ্ট করে পড়ে আছি ভালো ডাক্তার আছেন বলে। ডাক্তাররা আন্তরিক, কিন্তু এখানে সংকটের শেষ নেই।’
হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শয্যাসংকটের কারণেই এমন পরিবেশে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তবে আমরা প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসায় দিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা হচ্ছে না। বর্তমানে ভর্তি থাকা ১৭ শিশুর অবস্থা অনেকটাই ভালো।’
হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মিয়া মনজুর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের শিশু বিভাগের মোট শয্যা আছে ৪০টি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আজ সকাল পর্যন্ত ভর্তি আছে ১৬৪ জন। আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার আছেন। আমাদের চিকিৎসকরাও খুবই ভালো মানের। আমরা চাই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিভিন্ন সংকটে আমাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
হামে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যায় না জানিয়ে মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ‘তাহলে অন্য শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হবে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও এ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে নিচতলায় একটি ওয়ার্ড প্রস্তুত করে হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের সেখানে আইসোলেশন রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি। সংকটের কারণে সেখানে এখনো শয্যার ব্যবস্থা করতে পারিনি, যার কারণে রোগীদের কষ্ট করে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তবে আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। এ কারণে কষ্ট করে হলেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন।’